চিনের পাঠানো গাড়িতে মোদি-পুতিন একসাথে, বিশ্বকে বিশেষ কূটনৈতিক বার্তা

এসিও শীর্ষ সম্মেলনে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একসাথে গাড়িতে চড়েছেন। চীনের তিয়ানজিনে অনুষ্ঠিত শাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসিও) সম্মেলনের পর দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের জন্য যাওয়ার সময় পুতিনের ব্যক্তিগত রুশ-নির্মিত অরাস সেনেট লিমুজিনে করে দুই নেতা ভ্রমণ করেন। এই যৌথ যাত্রার ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করে প্রধানমন্ত্রী মোদি লিখেছেন, “তাঁর সাথে কথোপকথন সবসময়ই অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ”।

রাশিয়ার ক্রেমলিন পুল সাংবাদিক পাভেল জারুবিনের মতে, এই সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছিল মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে এবং এটি কেউ আগে থেকে জানতেন না। পুতিনের এই অভূতপূর্ব আমন্ত্রণ ভারত ও রাশিয়ার প্রতিনিধিদলকে চমকে দিয়েছিল। মোদি এবং পুতিন রিৎজ-কার্লটন হোটেলে রুশ নেতার আবাসে প্রায় এক ঘণ্টা একান্তে আলোচনা করার পর প্রতিনিধিদলদের সাথে যোগ দিয়ে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে মার্কিন প্রশাসনের তীব্র সমালোচনার প্রেক্ষাপটে এই ঘটনাটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। আগস্ট মাসে আমেরিকা ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে রুশ তেল আমদানির জন্য। ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্য উপদেষ্টা পিটার নাভারো দাবি করেছেন যে রাশিয়া ভারতের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনায় অস্ত্র ক্রয় করে। এই পরিস্থিতিতে মোদি-পুতিনের এই প্রকাশ্য ঘনিষ্ঠতা আমেরিকার চাপের মুখে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করে তুলেছে।

এসিও সম্মেলনে উপস্থিত তিন বৃহৎ শক্তির নেতা – মোদি, পুতিন ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং – একসাথে হাসিখুশি মুহূর্তে দেখা গেছেন। তারা হ্যান্ডশেক, আলিঙ্গন ও হাসাহাসিতে অংশ নিয়েছেন, যা পর্যবেক্ষকদের মতে ভারত-রাশিয়া-চীনের মধ্যে অস্বাভাবিক সৌহার্দ্যের প্রদর্শন। প্রধানমন্ত্রী মোদি এক্স (টুইটার)-এ লিখেছেন, “তিয়ানজিনে মিথস্ক্রিয়া অব্যাহত! এসিও শীর্ষ সম্মেলনে রাষ্ট্রপতি পুতিন ও রাষ্ট্রপতি শি’র সাথে দৃষ্টিভঙ্গি বিনিময়”।

রুশ প্রেসিডেন্টের অরাস সেনেট গাড়িটি বিশেষভাবে রাশিয়া থেকে আনা হয়েছিল, তবে চীনা কূটনৈতিক নম্বর প্লেট লাগানো হয়েছিল। এই গাড়িটি পুতিনের আন্তর্জাতিক সফরে নিয়মিত ব্যবহৃত হয় এবং তিনি অন্য নেতাদেরও এতে যাত্রার সুযোগ দিয়েছেন, যেমন উত্তর কোরিয়ার কিম জং উনকে এই গাড়ি উপহার দিয়েছিলেন। অপরদিকে প্রধানমন্ত্রী মোদিকে চীনা সরকার তাদের হংকি এল৫ গাড়ি প্রদান করেছিল, যা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংের পছন্দের গাড়ি এবং ২০১৯ সালে মহাবলীপুরমে মোদির সাথে দেখা করতে এসেছিলেন।

দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী মোদি পুতিনকে বলেছেন যে কঠিন পরিস্থিতিতেও ভারত ও রাশিয়া কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে যায়। তিনি বলেছেন, “এমনকি সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতেও ভারত ও রাশিয়া ধারাবাহিকভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের দৃঢ় অংশীদারিত্ব কেবল আমাদের দেশের জন্যই নয়, বিশ্বব্যাপী শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ”। পুতিন মোদিকে “প্রিয় মন্ত্রী মহোদয়, প্রিয় বন্ধু” বলে সম্বোধন করে বলেছেন যে রাশিয়া ও ভারতের মধ্যে কয়েক দশক ধরে বিশেষ সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে।

ইউক্রেন সংকট নিয়ে আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেছেন যে সাম্প্রতিক শান্তি প্রচেষ্টাগুলি স্বাগত এবং তিনি আশা করেন সকল পক্ষ দ্রুত যুদ্ধ শেষ করতে গঠনমূলক পদক্ষেপ নেবে। তিনি বলেছেন, “মানবতার আহ্বান হলো স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার উপায় খুঁজে বের করা।” একইসাথে মোদি পুতিনের ডিসেম্বরে ভারত সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এসিও সম্মেলনে বিশ্বব্যবস্থায় “গুন্ডামি আচরণ”-এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বলেছেন যে নেতাদের “ন্যায্যতা ও ন্যায়বিচারের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থাকতে হবে… স্নায়ুযুদ্ধের মানসিকতা, শিবির সংঘাত ও গুন্ডামি আচরণের বিরোধিতা করতে হবে”। তিনি উল্লেখ করেছেন যে এসিও দেশগুলোর সাথে চীনের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ২.৩ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

বৈদেশিক সচিব বিক্রম মিশ্র জানিয়েছেন যে মোদি ও পুতিনের এই বৈঠক তাদের “বিশেষ ও সুবিধাপ্রাপ্ত কৌশলগত অংশীদারিত্ব”-এর ১৫তম বার্ষিকীর প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাশিয়ার মতে, এই অংশীদারিত্ব বহুমুখী এবং আজকের বৈঠক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে এই ত্রিপক্ষীয় দৃশ্য (ভারত-রাশিয়া-চীন) আমেরিকার আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি অলিখিত ফ্রন্টের প্রতীক। ভারতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ও জোটনিরপেক্ষতার প্রতি অঙ্গীকারকে এটি তুলে ধরেছে, যখন ট্রাম্প প্রশাসন মিশ্র সংকেত পাঠাতে থাকে। এনডিটিভির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে যে এই দৃশ্যটি নতুন ভারত-রাশিয়া-চীন সম্প্রীতির ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।

আমেরিকার ৫০ শতাংশ শুল্কের চাপ সত্ত্বেও ভারত তার রুশ তেল আমদানি আরও ১০-২০ শতাংশ বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা করছে, যা দৈনিক প্রায় ১.৫০,০০০-৩,০০,০০০ ব্যারেল বেশি হবে। ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর থেকে ভারত রুশ তেলের অন্যতম বৃহত্তম ক্রেতা হয়ে উঠেছে এবং বর্তমানে দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ তেলের চাহিদা রাশিয়া থেকে আসে।

এই এসিও সম্মেলনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের উপস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী মোদি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে পাহালগাম সন্ত্রাসী হামলার উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন যে সন্ত্রাসবাদে দ্বিমুখী নীতি গ্রহণযোগ্য নয় এবং সন্ত্রাস অর্থায়নের বিরুদ্ধে ভারত সোচ্চার।

মার্কিন প্রশাসনের চাপের মুখে ভারত-রাশিয়া-চীনের এই প্রকাশ্য ঐক্য বিশ্ব কূটনীতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে এই চিত্র হাজার কথার চেয়ে বেশি কিছু বলে এবং ভূরাজনৈতিক ক্ষমতার নতুন ভারসাম্যের ইঙ্গিত দেয়। ট্রাম্পের শুল্ক নীতির বিরুদ্ধে এটি একটি সুস্পষ্ট বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে যে ভারত তার বন্ধুত্ব ও জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো আপস করবে না।