শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড: ছাত্র বিপ্লবের রক্তাক্ত দমনে ট্রাইব্যুনালের ঐতিহাসিক রায়

ঢাকা: বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সোমবার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছে। গত বছরের ছাত্র আন্দোলনের নৃশংস দমনকারী ঘটনায় তাঁকে সকল অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে, যার ফলে প্রায় ১৪০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। ভারতে নির্বাসিত হাসিনা অনুপস্থিতে বিচার হয়েছে এই ট্রাইব্যুনালে, যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এই রায়ের পর ঢাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোর করা হয়েছে, যাতে কোনো অশান্তি না ছড়ায়।

ট্রাইব্যুনালের তিন সদস্য বিচারকের প্যানেল ৪৫৩ পৃষ্ঠার বিস্তারিত রায় পাঠ করে ঘোষণা করেছে যে, হাসিনা ছাত্রদের বিরুদ্ধে নির্মম দমনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এতে তাঁর সঙ্গে সহ-অভিযুক্ত সাবেক গৃহমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বিচারকরা বলেছেন, “শেখ হাসিনা তাঁর দলীয় কর্মীদের মাধ্যমে ছাত্রদের হত্যা ও উচ্ছেদের নির্দেশ দিয়েছিলেন।” এই রায়টি ছাত্র আন্দোলনের শহীদ পরিবারগুলির জন্য বিচারের একটি মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অপারেশন ডেভিল হান্ট: উত্তপ্ত বাংলাদেশে সেনা অভিযান Operation Devil Hunt

এই ঘটনার পটভূমি ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ফিরে যায়, যখন সরকারি চাকরির কোটা ব্যবস্থা নিয়ে শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়। দ্রুতই এটি সরকারবিরোধী বিপ্লবে রূপ নেয়, যা হাসিনার ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটায়। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশ, সেনাবাহিনী এবং দলীয় গুণ্ডাদের ব্যবহার করে লাথিচার্জ, গুলি এবং এমনকি ড্রোন ও হেলিকপ্টার থেকে হামলা চালানো হয়। জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্টের মধ্যে ১৪০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং ২৫,০০০-এর বেশি আহত। এই দমনকারিতা বাংলাদেশের ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পর সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

হাসিনার সরকারের এই দমনের পেছনে ছিল তাঁর দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের ছায়া। ২০০৯ সাল থেকে তিনি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দেশ চালিয়েছিলেন, যার সময়কালে দুর্নীতি, গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। সাংবাদিক এবং কর্মীদের গ্রেপ্তার, সাইবার নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার এবং রাজনৈতিক সহিংসতা এই শাসনের চিহ্ন ছিল। ছাত্ররা কোটার পাশাপাশি এই স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসে, যা অবশেষে ৫ আগস্ট তাঁর পদত্যাগ ঘটায়। হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান এবং সেখানে নিরাপদ আশ্রয় নেন।

শেখ হাসিনার ভারতে গোপন অবস্থান: ১০০ দিন পর কী জানা গেল?

ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়া মাসখানেকেরও বেশি চলে, যাতে ৫৪ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল ছাত্রদের হত্যা, ফাঁসির নির্দেশ এবং মারাত্মক অস্ত্রের ব্যবহার। অভিযোগকারীরা প্রমাণ হিসেবে হাসিনার ফাঁসা অডিও এবং দলীয় নেতাদের সাথে তাঁর যোগাযোগ উপস্থাপন করে। ট্রাইব্যুনাল বলেছে, “এটি স্পষ্ট যে তিনি ছাত্রদের হত্যার জন্য উস্কানি দিয়েছিলেন এবং কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেননি।” বিচার হাসিনার অনুপস্থিতিতে হয়েছে, কারণ তিনি ফরার ঘোষিত। তাঁর আইনজীবীরা এই বিচারকে ‘অন্যায়’ বলে অভিহিত করেছেন এবং জাতিসংঘের বিশেষ র‍্যাপোর্টারের কাছে আবেদন জমা দিয়েছেন।

এই রায়ের পর হাসিনা প্রথম প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, “এটি একটি পক্ষপাতদুষ্ট এবং রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রায়।” ভারতের ইন্ডিয়া টুডের মাধ্যমে প্রকাশিত এই বিবৃতিতে তিনি ট্রাইব্যুনালকে ‘কাঙ্গারু কোর্ট’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর ছেলে সাজীব ওয়াজেদ বলেছেন, “আমরা আওয়ামী লীগ ছাড়া কোনো নির্বাচন মেনে নেব না। আমাদের প্রতিবাদ আরও তীব্র হবে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় না হস্তক্ষেপ করলে দেশে সহিংসতা ছড়াবে।” আওয়ামী লীগের সমর্থকরা এই রায়কে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে দেখছেন এবং দুদিনের হরতাল ডেকেছিলেন বিচারের আগে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই রায় নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। একজন ব্যবহারকারী টুইট করেছেন, “হাজারো সাক্ষী, এক মাসের বিপ্লব এবং ঐতিহাসিক রায়—হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে ২০২৪-এর ছাত্র আন্দোলনে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য।” আরেকজন লিখেছেন, “শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় অস্বস্তিকর, কারণ এটি অযাচিত সরকারের অধীনে হয়েছে। বিচার নিরপেক্ষ হতে হবে।” এই পোস্টগুলোতে হাসিনার সমর্থকরা রায়কে প্রত্যাখ্যান করছেন, যখন শহীদ পরিবারগুলো এটিকে বিচারের বিজয় বলে উদযাপন করছেন। ট্রাইব্যুনালের আদালতে রায় পড়ার সময় শহীদ পরিবারের সদস্যরা করতালি দিয়ে উদযাপন করেছিলেন।

বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনুস এই রায়কে ‘দায়বদ্ধতার প্রতীক’ বলে অভিহিত করেছেন। জাতিপুঞ্জীবাদীর নোবেল বিজয়ী ইউনুসের নেতৃত্বাধীন এই সরকার গণতান্ত্রিক নির্বাচনের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হবে। তবে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, যা রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে। ঢাকায় রায়ের পর অশান্তির আশঙ্কায় নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে এবং মোলোটভ ককটেল হামলার ঘটনা ঘটেছে। জাতিপুঞ্জীবাদী ন্যাশনাল সিটিজেন্স পার্টির নেতা এমডি সাদ্দাম হোসেন বলেছেন, “এই রায় দেখায় কোনো ব্যক্তি আইনের উর্ধ্বে নয়।”

আন্তর্জাতিকভাবে এই রায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হাসিনার প্রত্যর্পণের জন্য ভারতের কাছে আবেদন করেছে, কিন্তু ভারত এখনও নীরব। হাসিনাকে ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে দেখা হয়, এবং প্রত্যর্পণের সম্ভাবনা কম। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা বিচারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, যদিও এটি দেশের গণতান্ত্রিক পুনরুদ্ধারের পথে একটি পদক্ষেপ। সি.এন.এন.-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই রায় রাজনৈতিক অরাজকতা ছড়াতে পারে নির্বাচনের আগে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২০১০ সালে গঠিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য। তবে এবারের বিচারটি সাম্প্রতিক ঘটনা নিয়ে, যা এর কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক তুলেছে। হাসিনার সমর্থকরা বলছেন, এটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, যখন সমালোচকরা এটিকে শাসনের জন্য প্রয়োজনীয় বিচার বলছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি পোস্টে লেখা হয়েছে, “হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় শুধু বিচার নয়, এটি ছাত্রদের রক্তের প্রতিফলন।” এই রায়ের ফলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আরও বিচারের মুখোমুখি হতে পারেন।

এই ট্রাইব্যুনালের রায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি টার্নিং পয়েন্ট। এটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়বদ্ধতার প্রতিশ্রুতিকে শক্তিশালী করলেও, আওয়ামী লীগের সমর্থকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়াতে পারে। নির্বাচনের পথে এই রায় অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে, যদি না আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ হয়। হাসিনার ছেলে সাজীবের সতর্কবাণী যেন একটি সতর্কতা—দেশের স্থিতিশীলতা এখন নির্বাচিত নেতৃত্বের উপর নির্ভরশীল। শেষ পর্যন্ত, এই রায় শুধু একজন নেত্রীর পতন নয়, বরং গণতন্ত্রের পুনরুজ্জীবনের একটি চেষ্টা। ভবিষ্যতে কী হবে, তা নির্ভর করবে নির্বাচনের ফলাফল এবং আন্তর্জাতিক সমর্থনের উপর।