ভারতের শেয়ার বাজারে এই মুহূর্তে সবচেয়ে আলোচিত নাম লেন্সকার্ট আইপিও (Lenskart IPO)। যেমনটা আশা করা হয়েছিল, প্রথম দিনেই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রবল উৎসাহ দেখা গেছে। ৩১শে অক্টোবর, ২০২৫-এ খোলার সাথে সাথেই এই মেগা ₹৭,২৭৮ কোটি টাকার আইপিওটি প্রথম দিনেই সম্পূর্ণ সাবস্ক্রাইবড হয়ে গেছে। এনএসই (NSE) তথ্য অনুযায়ী, প্রথম দিনের শেষে আইপিওটি ১.১৩ গুণ সাবস্ক্রাইবড হয়েছে, যার মধ্যে রিটেল (খুচরো) বিনিয়োগকারীদের অংশ ১.৩১ গুণ এবং যোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতাদের (QIB) অংশ ১.৪২ গুণ বুক হয়েছে। কোম্পানির প্রাইস ব্যান্ড ₹৩৮২ থেকে ₹৪০২ প্রতি শেয়ার রাখা হয়েছে এবং গ্রে মার্কেট প্রিমিয়াম (GMP) প্রায় ₹৬৫-₹৭০ স্তরে রয়েছে, যা একটি শক্তিশালী তালিকার ইঙ্গিত দিচ্ছে। কিন্তু এই ₹৭০,০০০ কোটি টাকার আকাশছোঁয়া ভ্যালুয়েশন কি যুক্তিযুক্ত? এই হাইপ-এর পেছনে কতটা সারবত্তা আছে? এই নিবন্ধে, আমরা লেন্সকার্টের ব্যবসা, এর আর্থিক স্থিতি এবং এই আইপিও-তে আপনার বিনিয়োগ করা উচিত কিনা তার একটি ৩৬০-ডিগ্রি বিশ্লেষণ করব।
লেন্সকার্ট আইপিও: ঝড়ের গতিতে প্রথম দিনের সাবস্ক্রিপশন
লেন্সকার্টের আইপিও নিয়ে বাজারে যে উন্মাদনা ছিল, তা প্রথম দিনের সাবস্ক্রিপশন ডেটাতে পরিষ্কার। এটি ২০২৫ সালের অন্যতম বড় আইপিও এবং বিনিয়োগকারীরা, বিশেষ করে খুচরো এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা, এতে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন।
প্রথম দিনের পরিসংখ্যান (৩১ অক্টোবর, ২০২৫)
দ্য ইকোনমিক টাইমস এবং টাইমস অফ ইন্ডিয়া অনুসারে, প্রথম দিনের শেষে সাবস্ক্রিপশনের চিত্রটি নিম্নরূপ:
- মোট সাবস্ক্রিপশন: ১.১৩ গুণ
- খুচরো বিনিয়োগকারী (RIIs): ১.৩১ গুণ
- যোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতা (QIBs): ১.৪২ গুণ
- অ-প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী (NIIs): ০.৪১ গুণ (সাধারণত শেষ দিনে NII কোটা বেশি পূরণ হয়)
এই পরিসংখ্যানগুলি দেখায় যে বাজারে লেন্সকার্টের ব্র্যান্ড ভ্যালু এবং এর গ্রোথ স্টোরির ওপর বিনিয়োগকারীদের দৃঢ় আস্থা রয়েছে। QIB এবং রিটেল অংশের সম্পূর্ণ সাবস্ক্রিপশন একটি ইতিবাচক লক্ষণ হিসাবে বিবেচিত হয়।
আইপিও-র গুরুত্বপূর্ণ বিবরণ (Lenskart IPO Details)
বিনিয়োগ করার আগে, আইপিও সম্পর্কিত মূল তথ্যগুলি এক নজরে দেখে নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই তথ্যগুলি কোম্পানির রেড হেরিং প্রসপেক্টাস (RHP) থেকে নেওয়া হয়েছে।
| বিবরণ | তথ্য |
| আইপিও খোলার তারিখ | ৩১ অক্টোবর, ২০২৫ |
| আইপিও বন্ধের তারিখ | ৪ নভেম্বর, ২০২৫ |
| প্রাইস ব্যান্ড | ₹৩৮২ – ₹৪০২ প্রতি ইক্যুইটি শেয়ার |
| লট সাইজ | ৩৭ টি শেয়ার |
| মোট ইস্যু সাইজ | ₹৭,২৭৮.০২ কোটি |
| ফ্রেশ ইস্যু (Fresh Issue) | ₹২,১৫০ কোটি (এই টাকা কোম্পানিতে যাবে) |
| অফার ফর সেল (OFS) | ₹৫,১২৮.০২ কোটি (এই টাকা বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডারদের কাছে যাবে) |
| ন্যূনতম বিনিয়োগ (রিটেল) | ₹১৪,৮৭৪ (১ লট, আপার ব্যান্ডে) |
| অ্যালোটমেন্টের তারিখ | ৬ নভেম্বর, ২০২৫ (সম্ভাব্য) |
| লিস্টিং-এর তারিখ | ১০ নভেম্বর, ২০২৫ (সম্ভাব্য) |
| লিস্টিং | বিএসই (BSE) এবং এনএসই (NSE) |
| রেজিস্ট্রার | এমইউএফজি ইনটাইম ইন্ডিয়া (MUFG Intime India) |
বাজার কি সত্যিই উত্তপ্ত? GMP এবং ভ্যালুয়েশন বিশ্লেষণ
আইপিও-র প্রথম দিনের সাফল্য এক জিনিস, কিন্তু আসল প্রশ্ন হল এর ভ্যালুয়েশন। লেন্সকার্ট প্রায় ₹৭০,০০০ কোটি টাকার (প্রায় $৮.৪ বিলিয়ন) বাজার মূলধন চাইছে, যা ভারতীয় রিটেল স্পেসে একটি বিশাল সংখ্যা।
GMP-এর আসল অর্থ (Grey Market Premium)
বিজনেস টুডে-র রিপোর্ট অনুযায়ী, লেন্সকার্ট আইপিও-র গ্রে মার্কেট প্রিমিয়াম (GMP) বর্তমানে ₹৬৫ থেকে ₹৭০-এর মধ্যে ঘোরাফেরা করছে।
GMP কী? গ্রে মার্কেট হল একটি অনানুষ্ঠানিক বাজার যেখানে আইপিও শেয়ারগুলি তালিকাভুক্তির আগে লেনদেন হয়। ₹৭০-এর GMP-এর অর্থ হল, বাজার আশা করছে যে শেয়ারটি তার আপার প্রাইস ব্যান্ড ₹৪০২-এর উপরে আরও ₹৭০ যোগ করে প্রায় ₹৪৭২-তে তালিকাভুক্ত হতে পারে। এটি প্রায় ১৬-১৭% তালিকাভুক্তির লাভের (Listing Gain) ইঙ্গিত দেয়। যদিও GMP একটি আনুষ্ঠানিক সূচক নয়, এটি বাজারের সেন্টিমেন্ট বুঝতে সাহায্য করে।
৬টি ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় খাদ্য ব্র্যান্ড: ৫০+ বছর ধরে কোটি কোটি টাকার ব্যবসায় সফল”
₹৭০,০০০ কোটির আকাশছোঁয়া ভ্যালুয়েশন
লেন্সকার্টের এই ভ্যালুয়েশনই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। কোম্পানির FY25-এর আয়ের ভিত্তিতে, এর প্রাইস-টু-আর্নিংস (P/E) অনুপাত ২০০-এর বেশি, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল বলে মনে হচ্ছে। স্বস্তিকা ইনভেস্টমার্ট-এর একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই মূল্যায়নে, স্টকটি ‘پرائسڈ فار پرفیکشن’ (priced for perfection), যার মানে হল যে কোনও ছোটখাটো ভুল বা গ্রোথ কম হলেই স্টকের দামে বড় ধরনের পতন হতে পারে।
এই উচ্চ ভ্যালুয়েশনকে রক্ষা করতে, প্রখ্যাত বিনিয়োগকারী শঙ্কর শর্মা ময়দানে নেমেছেন। তিনি টুইটারে (বর্তমানে X) বলেছেন যে লেন্সকার্টকে অন্যায়ভাবে টার্গেট করা হচ্ছে। তার মতে, জোম্যাটো (Zomato), নাইকা (Nykaa) বা পেটিএম (Paytm)-এর মতো অন্যান্য টেক আইপিওগুলি তাদের রাজস্বের ২৫-৫০ গুণ ভ্যালুয়েশনে এসেছিল, সেই তুলনায় লেন্সকার্টের ১০ গুণ সেলস ভ্যালুয়েশন (EV/Sales) অনেক সস্তা।
ভ্যালুয়েশন নিয়ে বিতর্ক: একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক
এই ভ্যালুয়েশন বিতর্কের আগুনে ঘি ঢেলেছে আরেকটি খবর। রিপোর্ট অনুযায়ী, কোম্পানির সহ-প্রতিষ্ঠাতা পীযূষ বনসল (Peyush Bansal) নিজে জুলাই ২০২৫-এ (আইপিও-র মাত্র কয়েক মাস আগে) ₹৫২ প্রতি শেয়ার মূল্যে কোম্পানির শেয়ার কিনেছিলেন। এখন সেই শেয়ার আইপিও-তে ₹৪০২ মূল্যে অফার করা হচ্ছে, যা প্রায় ৮ গুণ বেশি। যদিও এটি একটি সেকেন্ডারি লেনদেন হতে পারে, তবে এই অপটিক্স খুচরো বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি করেছে। একই সাথে, পীযূষ বনসল নিজেও এই আইপিও-র অফার ফর সেল (OFS)-এ ₹৮৩২ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করছেন।
লেন্সকার্ট: শুধু চশমার দোকান নয়, একটি টেক-জায়ান্ট
এই উচ্চ ভ্যালুয়েশন বোঝার জন্য, লেন্সকার্টকে শুধু একটি চশমা বিক্রেতা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একটি ওমনি-চ্যানেল (omnichannel) টেকনোলজি কোম্পানি।
বৈপ্লবিক O2O বিজনেস মডেল
লেন্সকার্ট ২০০৮ সালে শুরু হয়েছিল এবং ২০১০ সালে একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম হিসাবে কাজ শুরু করে। কিন্তু তারা দ্রুত বুঝতে পারে যে ভারতে চশমার মতো একটি ‘টাচ অ্যান্ড ফিল’ (touch and feel) পণ্যের জন্য শুধু অনলাইন যথেষ্ট নয়। তারা একটি অনলাইন-টু-অফলাইন (O2O) মডেল তৈরি করে।
আজ, লেন্সকার্টের বিশ্বব্যাপী ২,৮০০টিরও বেশি স্টোর রয়েছে, যার মধ্যে ২,১৩৭টি স্টোর ভারতে রয়েছে। তাদের মডেলটি দুর্দান্ত: ১. গ্রাহকরা অনলাইনে হাজার হাজার ফ্রেম দেখেন, ৩ডি ভার্চুয়াল ট্রাই-অন (3D Virtual Try-on) ব্যবহার করেন। ২. তারা অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক করে নিকটবর্তী ফিজিক্যাল স্টোরে গিয়ে বিনামূল্যে চোখ পরীক্ষা করান। ৩. স্টোরে তারা ফ্রেমগুলি হাতে নিয়ে দেখেন এবং অর্ডার দেন। ৪. কোম্পানি তাদের নিজস্ব ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিটে সেই চশমা তৈরি করে সরাসরি গ্রাহকের বাড়িতে পৌঁছে দেয়।
এই ইন্টিগ্রেটেড মডেলটি তাদের সাপ্লাই চেইন এবং গ্রাহকের অভিজ্ঞতার ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দেয়।
স্মার্ট মিটার কী ভাবে কাজ করে? জানুন সুবিধা-অসুবিধা এবং ব্যবহারকারীদের অভিযোগ
প্রযুক্তির ক্ষমতা
প্রযুক্তিই লেন্সকার্টের মেরুদণ্ড। তাদের মোবাইল অ্যাপে ভার্চুয়াল ট্রাই-অন (Virtual Try-on) ফিচারটি একটি গেম-চেঞ্জার ছিল, যা গ্রাহকদের ঘরে বসেই শত শত ফ্রেম তাদের মুখে কেমন দেখাবে তা পরীক্ষা করার সুবিধা দিয়েছে। এর পাশাপাশি, তারা এআই (AI) ব্যবহার করে গ্রাহকের মুখের গঠন অনুযায়ী ফ্রেম সুপারিশ করে। তারা জাপান এবং থাইল্যান্ডের মতো দেশে রিমোট আই-এক্সামিনেশন (Remote Eye Examination) পরিষেবাও চালু করেছে।
গ্লোবাল ফুটপ্রিন্ট এবং নিজস্ব ম্যানুফ্যাকচারিং
লেন্সকার্ট শুধু ভারতেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০২২ সালে জাপানের জনপ্রিয় আইওয়্যার চেইন ‘ওনডেজ’ (Owndays) এবং স্পেনের ‘মেলার’ (Meller) অধিগ্রহণ করে তারা এশিয়া এবং ইউরোপে তাদের উপস্থিতি শক্তিশালী করেছে। দ্য মোয়াট ইনভেস্টর অনুসারে, কোম্পানির প্রায় ৪০% রাজস্ব এখন আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আসে।
এর সবচেয়ে বড় শক্তি হল এর নিজস্ব ম্যানুফ্যাকচারিং। গুরুগ্রাম, ভিওয়াড়ি এবং সম্প্রতি হায়দ্রাবাদে (যা বিশ্বের বৃহত্তম চশমা তৈরির সুবিধা হতে চলেছে) তাদের কারখানা রয়েছে। এটি তাদের খরচ কম রাখতে এবং গুণমান নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে, যা তাদের ₹৯৯৯-এ দুটি চশমার মতো অফার দিতে সক্ষম করে।
কোম্পানির আর্থিক স্বাস্থ্য: লাভ না লোকসান?
যেকোনো আইপিও-তে বিনিয়োগের আগে কোম্পানির আর্থিক খতিয়ান দেখা সবচেয়ে জরুরি। লেন্সকার্টের ক্ষেত্রে, ছবিটি বেশ আকর্ষণীয় এবং কিছুটা জটিল।
রাজস্বের রকেট গতি
লেন্সকার্টের রাজস্ব বৃদ্ধি অসাধারণ।
- অর্থবর্ষ ২০২৪ (FY24): কোম্পানির রাজস্ব ছিল ₹৫,৬১০ কোটি।
- অর্থবর্ষ ২০২৫ (FY25): রাজস্ব প্রায় ২৩% বৃদ্ধি পেয়ে ₹৬,৬৫৩ কোটি হয়েছে।
এই বৃদ্ধি তাদের শক্তিশালী বাজার দখল এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণের প্রমাণ।
লাভের আসল সত্যি: একটি অ্যাকাউন্টিং বিতর্ক
এটাই এই আইপিও-র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ। FY24-এ কোম্পানিটি ₹১০ কোটি টাকার সামান্য লোকসানে ছিল। কিন্তু FY25-এ, কোম্পানিটি ₹২৯৭ কোটি টাকার বিশাল মুনাফা (Net Profit) দেখিয়েছে। এটি একটি দুর্দান্ত টার্নঅ্যারাউন্ড!
কিন্তু এখানে একটি বড় ‘কিন্তু’ রয়েছে।
এই ₹২৯৭ কোটি লাভের মধ্যে ₹১৬৭ কোটি টাকা এসেছে একটি ‘ওয়ান-টাইম অ্যাকাউন্টিং গেইন’ (FVTPL gain) থেকে, যা ‘ওনডেজ’ অধিগ্রহণের সাথে সম্পর্কিত একটি নন-ক্যাশ আইটেম।
এর মানে হল, কোম্পানির আসল অপারেশনাল বা কার্যকরী লাভ ₹২৯৭ কোটি নয়, বরং প্রায় ₹১৩০ কোটি (₹২৯৭ কোটি – ₹১৬৭ কোটি)।
এই অ্যাডজাস্টেড লাভের (Adjusted Profit) নিরিখে, কোম্পানির P/E অনুপাত ২০০-এর থেকেও অনেক বেশি হয়ে যায়, যা ভ্যালুয়েশনকে আরও ব্যয়বহুল করে তোলে। এটি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি রেড ফ্ল্যাগ (Red Flag) হতে পারে, কারণ এটি দেখায় যে হেডলাইন প্রফিট কিছুটা স্ফীত।
লেন্সকার্ট ফিনান্সিয়াল স্ন্যাপশট (FY24 বনাম FY25)
| আর্থিক মেট্রিক | অর্থবর্ষ ২০২৪ (FY24) | অর্থবর্ষ ২০২৫ (FY25) |
| মোট রাজস্ব | ₹৫,৬১০ কোটি | ₹৬,৬৫৩ কোটি |
| রাজস্ব বৃদ্ধি (YoY) | – | ২২.৬% |
| রিপোর্টেড নেট প্রফিট (PAT) | -₹১০ কোটি (লোকসান) | ₹২৯৭ কোটি (লাভ) |
| অ্যাডজাস্টেড নেট প্রফিট (প্রায়) | -₹১০ কোটি (লোকসান) | ~₹১৩০ কোটি (লাভ) |
| EBITDA মার্জিন | ১১.৯৮% | ১৩.৮৫% |
| গ্রস মার্জিন | – | ৬৭.৯% |
(সূত্র: ইকোনমিক টাইমস, প্রাইভেট সার্কেল, দ্য মোয়াট ইনভেস্টর থেকে সংকলিত তথ্য)
লেন্সকার্ট বনাম টাইটান আইপ্লাস: বাজারে কে এগিয়ে?
ভারতে লেন্সকার্টের সবচেয়ে বড় সংগঠিত প্রতিযোগী হল টাটা গ্রুপের টাইটান আইপ্লাস (Titan Eye+)।
- বাজারের আকার: ভারতের চশমার বাজার এখনও ৭৭% অসংগঠিত। এর মানে হল লেন্সকার্ট এবং টাইটান উভয়ের জন্যই বেড়ে ওঠার বিশাল সুযোগ রয়েছে।
- রাজস্বে বিশাল পার্থক্য: স্ক্যানএক্স.ট্রেড (Scanx.trade) অনুসারে, FY25-এ যেখানে লেন্সকার্টের রাজস্ব ₹৬,৬৫৩ কোটি, সেখানে টাইটান আইপ্লাসের রাজস্ব মাত্র ₹৭৯৬ কোটি। লেন্সকার্ট তার নিকটতম প্রতিযোগীর চেয়ে প্রায় ৮.৩ গুণ বড়।
- স্টোর নেটওয়ার্ক: লেন্সকার্টের ভারতে ২,১৩৭টি স্টোর রয়েছে, যেখানে টাইটান আইপ্লাসের ৯০০টির বেশি স্টোর রয়েছে।
- লাভজনকতা: যদিও টাইটান আইপ্লাসের ব্যবসা ছোট, এটি একটি স্থিতিশীল এবং লাভজনক ব্যবসা যার EBIT মার্জিন প্রায় ১০.৭%। অন্যদিকে, লেন্সকার্ট উচ্চ-বৃদ্ধির ওপর বাজি ধরছে এবং এর অ্যাডজাস্টেড নেট প্রফিট মার্জিন এখনও অনেক কম (প্রায় ১.৯%)।
মাত্র ১৫ মিনিটে পরিচারিকা বুকিং! আরবান কোম্পানির নতুন পরিষেবা নিয়ে বিতর্ক
এই তুলনা স্পষ্ট করে দেয় যে লেন্সকার্ট একটি ‘হাই গ্রোথ, হাই রিস্ক’ স্টক, আর টাইটান আইপ্লাস একটি ‘স্টেডি, স্টেবল’ প্লেয়ার।
বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশ্লেষণ: কেনা উচিত? (Apply or Avoid?)
এবার আসা যাক মিলিয়ন ডলারের প্রশ্নে: লেন্সকার্ট আইপিও-তে আপনার আবেদন করা উচিত? এর উত্তর ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-তে দেওয়া অসম্ভব। এটি সম্পূর্ণভাবে আপনার ঝুঁকির ক্ষমতা এবং বিনিয়োগের লক্ষ্যের ওপর নির্ভরশীল। আমরা এখানে সুবিধা এবং ঝুঁকিগুলি তুলে ধরছি।
আইপিও-তে বিনিয়োগের কারণ (The “Bull” Case – কেন কিনবেন?)
১. মার্কেট লিডার: লেন্সকার্ট ভারতের সংগঠিত চশমা বাজারে निर्विवाद নেতা। অসংগঠিত বাজার থেকে সংগঠিত বাজারে শিফট হওয়ার পুরো সুবিধা পাবে এই কোম্পানি। ২. শক্তিশালী O2O মডেল: তাদের অনলাইন-অফলাইন ইন্টিগ্রেটেড মডেলটি নকল করা কঠিন এবং এটি গ্রাহকদের একটি দুর্দান্ত অভিজ্ঞতা দেয়। ৩. টেক এবং ডেটা: কোম্পানিটি প্রযুক্তি এবং ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করে গ্রাহকের চাহিদা বুঝতে পারে, যা তাদের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখে। ৪. গ্লোবাল উচ্চাকাঙ্ক্ষা: ‘ওনডেজ’ অধিগ্রহণের মাধ্যমে তারা দেখিয়েছে যে তারা শুধু একটি ভারতীয় কোম্পানি নয়, একটি গ্লোবাল প্লেয়ার হতে চায়। ৫. শক্তিশালী ব্র্যান্ড: পীযূষ বনসলের (কাল্পনিক অভ্যন্তরীণ লিঙ্ক) ‘শার্ক ট্যাঙ্ক ইন্ডিয়া’ উপস্থিতি লেন্সকার্টকে একটি ‘হাউসহোল্ড নেম’-এ পরিণত করেছে, যা তাদের মার্কেটিং খরচ কমিয়েছে।
ঝুঁকির কারণ (The “Bear” Case – কেন এড়িয়ে চলবেন?)
১. অত্যন্ত ব্যয়বহুল ভ্যালুয়েশন: এটাই সবচেয়ে বড় ঝুঁকির কারণ। ২০০-এর বেশি P/E মানে হল বাজার আগামী কয়েক বছরের বৃদ্ধিকে ইতিমধ্যেই ডিসকাউন্ট করে নিয়েছে। এখান থেকে বড় রিটার্ন পেতে হলে কোম্পানিকে ত্রুটিহীনভাবে পারফর্ম করতে হবে।
২. লাভের গুণমান (Quality of Profit): FY25-এর মুনাফা একটি ওয়ান-টাইম অ্যাকাউন্টিং গেইন দ্বারা স্ফীত। এই উচ্চ লাভ যদি টেকসই না হয়, তবে বাজারের সেন্টিমেন্ট দ্রুত বদলে যেতে পারে।
৩. OFS-এর প্রভাব: এটি একটি ₹৭,২৭৮ কোটির আইপিও, কিন্তু এর মধ্যে ₹৫,১২৮ কোটি (প্রায় ৭০%) হল OFS। এর মানে হল এই টাকাটা কোম্পানিতে যাচ্ছে না, বরং পুরনো বিনিয়োগকারী (কাল্পনিক অভ্যন্তরীণ লিঙ্ক) (যেমন সফটব্যাঙ্ক, কেদারা ক্যাপিটাল) এবং প্রতিষ্ঠাতারা তাদের শেয়ার বিক্রি করে লাভ তুলে নিচ্ছেন।
৪. চীন নির্ভরতা: স্বস্তিকা-র বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কোম্পানি কাঁচামালের জন্য ৪০% চীনের ওপর নির্ভরশীল, যা ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করে।
৫. প্রতিষ্ঠাতার শেয়ার বিক্রয়: পীযূষ বনসল সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠাতারাও OFS-এ শেয়ার বিক্রি করছেন, যা কিছু বিনিয়োগকারীর কাছে নেতিবাচক সংকেত হতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদী না তালিকাভুক্তির লাভ?
লেন্সকার্টের আইপিও নিঃসন্দেহে ভারতীয় বাজারের জন্য একটি বড় ঘটনা। প্রথম দিনের সম্পূর্ণ সাবস্ক্রিপশন এবং শক্তিশালী GMP (₹৭০) প্রমাণ করে যে বাজারে ‘হাইপ’ তুঙ্গে।
লিস্টিং গেইনের জন্য: যদি আপনি শুধুমাত্র তালিকাভুক্তির লাভের জন্য আবেদন করতে চান, তবে বর্তমান GMP (১৬-১৭%) একটি মাঝারি লাভের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এটি একটি নিশ্চিত মাল্টিব্যাগার হওয়ার সম্ভাবনা কম, তবে ইতিবাচক তালিকাভুক্তির সম্ভাবনাই বেশি।
দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের জন্য: এখানে আসল পরীক্ষা। লেন্সকার্টে বিনিয়োগ করা হল ভারতের কনজিউমার-টেক স্টোরির ওপর বাজি ধরা। আপনি যদি বিশ্বাস করেন যে লেন্সকার্ট আগামী ১০ বছরে চশমার বাজারের ‘মারুতি’ বা ‘টাইটান’ হয়ে উঠতে পারবে, তবে এই উচ্চ ভ্যালুয়েশন সত্ত্বেও এটি একটি ভাল দীর্ঘমেয়াদী বাজি হতে পারে। কিন্তু, আপনাকে অবশ্যই এর অত্যন্ত ব্যয়বহুল ভ্যালুয়েশন এবং লাভের গুণমান নিয়ে যে প্রশ্নগুলি রয়েছে, সে সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে।
আমাদের পরামর্শ হল, হাইপ-এ গা না ভাসিয়ে, আপনার নিজের ঝুঁকি মূল্যায়ন করুন। লেন্সকার্ট একটি দুর্দান্ত কোম্পানি, কিন্তু একটি দুর্দান্ত কোম্পানি সবসময় একটি দুর্দান্ত ‘বিনিয়োগ’ নাও হতে পারে, বিশেষ করে যদি দামটি খুব বেশি হয়।
(দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র তথ্যগত উদ্দেশ্যে লেখা। এটি কোনও বিনিয়োগের পরামর্শ নয়। আইপিও-তে বিনিয়োগ বাজারের ঝুঁকির সাপেক্ষে। বিনিয়োগ করার আগে অনুগ্রহ করে আপনার আর্থিক উপদেষ্টার সাথে পরামর্শ করুন এবং আইপিও-র RHP সাবধানে পড়ুন।)