Think Bengal

হজরতবাল দরগায় অশোক স্তম্ভ ঘিরে বিতর্ক: ধর্মীয় অনুভূতি বনাম জাতীয় প্রতীক, উত্তাল কাশ্মীর

Published By: Chanchal Sen | Published On:
Share:

 হজরত মোহাম্মদ (সাঃ)-এর পবিত্র স্মৃতিচিহ্ন ধারণকারী কাশ্মীরের শতাব্দী প্রাচীন হজরতবাল দরগায় একটি সংস্কার ফলকে ভারতের জাতীয় প্রতীক অশোক স্তম্ভের খোদাই ঘিরে তীব্র বিতর্ক দানা বেঁধেছে। ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাতের অভিযোগে পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, শুক্রবার প্রার্থনার পর উত্তেজিত জনতা ফলকটি ভেঙে ফেলে।এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে জম্মু ও কাশ্মীরের রাজনীতিতে নতুন করে শোরগোল পড়েছে, যেখানে ধর্মীয় বিশ্বাস, জাতীয়তাবাদ এবং রাজনৈতিক আধিপত্যের জটিল সমীকরণ সামনে চলে এসেছে।

এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইসলাম ধর্মের একটি মূল ভিত্তি – ‘তৌহিদ’ বা এক ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস। ইসলামে মূর্তি বা কোনও প্রাণীর প্রতিকৃতি উপাসনার কঠোর বিরোধিতা করা হয়। হজরতবাল দরগার মতো একটি পবিত্র স্থানে অশোক স্তম্ভের সিংহমূর্তি খোদাই করাকে বহু ধর্মপ্রাণ মুসলমান তাঁদের বিশ্বাসের পরিপন্থী বলে মনে করছেন।3 তাঁদের মতে, এটি ইসলামি আকিদা বা মতাদর্শের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।4

ঘটনার সূত্রপাত এবং বিতর্কের আগুন

সম্প্রতি জম্মু ও কাশ্মীর ওয়াকফ বোর্ডের তত্ত্বাবধানে হজরতবাল দরগার সৌন্দর্যায়ন এবং সংস্কারের একটি বড় প্রকল্প শেষ হয়েছে। এই প্রকল্পের শেষে একটি ফলক উন্মোচন করা হয়, যেখানে প্রকল্পের বিবরণের সাথে অশোক স্তম্ভ খোদাই করা ছিল।এই ফলকটি উন্মোচন করেন ওয়াকফ বোর্ডের চেয়ারপার্সন এবং ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-র নেত্রী ডঃ দরখশান আন্দ্রাবি।

কিন্তু ফলকটি স্থাপনের পর থেকেই স্থানীয় মানুষ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিতে শুরু করে। ন্যাশনাল কনফারেন্স (এনসি)-এর মতো প্রধান বিরোধী দলগুলি এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করে। এনসি-র প্রধান মুখপাত্র এবং জাদিবালে বিধায়ক তানভীর সাদিক এই বিষয়ে প্রথম থেকেই সরব হন। তিনি তাঁর এক্স (পূর্ববর্তী টুইটার) হ্যান্ডেলে লেখেন, “আমি ধর্মগুরু নই, কিন্তু ইসলামে মূর্তিপূজা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ – এটি সবচেয়ে বড় পাপ। আমাদের বিশ্বাসের ভিত্তি হল তৌহিদ। হজরতবালের মতো পবিত্র দরগায় একটি ভাস্কর্য স্থাপন করা এই বিশ্বাসের পরিপন্থী।7 পবিত্র স্থানগুলিতে কেবল তৌহিদের বিশুদ্ধতা প্রতিফলিত হওয়া উচিত, আর কিছু নয়।”

এই সমালোচনার পর, শুক্রবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৫-এ ঈদ-মিলাদ-উন-নবীর প্রাক্কালে দরগায় বিশাল জনসমাগম হয়। জুমার নামাজের পর কিছু উত্তেজিত ব্যক্তি পাথর দিয়ে ফলকটির একাংশ ভেঙে ফেলে, বিশেষ করে অশোক স্তম্ভের খোদাইটি তারা নষ্ট করে দেয়।8 এই ঘটনার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হলে উত্তেজনা আরও বাড়ে।

রাজনৈতিক তরজা এবং পরস্পরবিরোধী অবস্থান

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে জম্মু ও কাশ্মীরের রাজনীতি দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে। একদিকে ওয়াকফ বোর্ডের চেয়ারপার্সন ডঃ দরখশান আন্দ্রাবি এই ভাঙচুরের ঘটনাকে ‘সন্ত্রাসবাদী হামলা’ এবং ‘জাতীয় প্রতীকের অপমান’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন, এমনকি তাঁদের বিরুদ্ধে জননিরাপত্তা আইন (পিএসএ)-এর মতো কঠোর আইন প্রয়োগের কথাও বলেছেন।

এক সাংবাদিক সম্মেলনে আন্দ্রাবি বলেন, “এটি শুধু একটি পাথরের ফলক ভাঙা নয়, এটি সংবিধানের উপর আঘাত। যারা জাতীয় প্রতীক নিয়ে সমস্যা তৈরি করছে, তাদের ভারতীয় মুদ্রা ব্যবহার করাও বন্ধ করা উচিত, কারণ তাতেও অশোক স্তম্ভ রয়েছে।” তিনি এই ঘটনার জন্য সরাসরি ন্যাশনাল কনফারেন্সকে দায়ী করে বলেন যে, তারা কাশ্মীরের শান্ত পরিবেশকে বিঘ্নিত করার চেষ্টা করছে।

অন্যদিকে, ন্যাশনাল কনফারেন্স এবং পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি (পিডিপি) ওয়াকফ বোর্ডের এই পদক্ষেপকে ‘সংবেদনশীলতাহীন’ এবং ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে ইচ্ছাকৃত আঘাত’ বলে মনে করছে। এনসি-র শ্রীনগরের সাংসদ আগা রুহুল্লাহ মেহদি বলেছেন, “হজরতবালের মতো পবিত্র স্থানে ব্যক্তিগত অহংকার জাহির করার চেষ্টা ভক্তির প্রকাশ নয়, বরং ঔদ্ধত্যের প্রদর্শন। মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে খেলা করার এই বিপজ্জনক চেষ্টার ফলেই মানুষ ক্ষুব্ধ হয়েছে।”

পিডিপি নেত্রী ইলতিজা মুফতিও আন্দ্রাবির মন্তব্যের সমালোচনা করে বলেছেন, “কাশ্মীরিদের ‘জঙ্গি’ বলা এবং পিএসএ লাগানোর হুমকি বিজেপির দমনমূলক এবং সাম্প্রদায়িক মানসিকতারই প্রতিফলন।”

বিতর্কের ঐতিহাসিক এবং ধর্মীয় প্রেক্ষাপট

হজরতবাল দরগা কেবল একটি মসজিদ নয়, এটি কাশ্মীরি মুসলমানদের জন্য গভীর আবেগ এবং শ্রদ্ধার কেন্দ্র এখানে হজরত মোহাম্মদ (সাঃ)-এর দাড়ি মোবারকের একটি কেশ (মোই-এ-মুকদ্দাস) সংরক্ষিত আছে বলে বিশ্বাস করা হয়। প্রতি বছর বিশেষ বিশেষ দিনে এই পবিত্র স্মৃতিচিহ্ন দর্শনের জন্য লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম হয়। এর ঐতিহাসিক এবং আধ্যাত্মিক গুরুত্ব অপরিসীম।

অন্যদিকে, অশোক স্তম্ভ ভারতের জাতীয় প্রতীক। মৌর্য সম্রাট অশোকের সারনাথের সিংহচতুর্মুখ স্তম্ভশীর্ষ থেকে গৃহীত এই প্রতীক ভারতের সার্বভৌমত্ব, শক্তি, সাহস এবং আত্মবিশ্বাসের পরিচায়ক। এর নিচে দেবনাগরী হরফে লেখা ‘সত্যমেব জয়তে’ (সত্যের জয় অবশ্যম্ভাবী) ভারতের জাতীয় নীতিবাক্য। জাতীয় প্রতীক হিসেবে এর মর্যাদা প্রশ্নাতীত।

এই দুই ভিন্ন প্রেক্ষাপটের প্রতীকের সহাবস্থান নিয়েই মূল দ্বন্দ্ব। একদিকে রয়েছে একটি ধর্মের মৌলিক বিশ্বাস, যা কোনও প্রকার প্রতিকৃতি বা মূর্তিকে স্বীকার করে না; অন্যদিকে রয়েছে একটি রাষ্ট্রের জাতীয় পরিচয় ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক।

সংস্কার প্রকল্পের আর্থিক দিক

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ‘ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট অফ হজরতবাল শ্রাইন’ প্রকল্পটি কেন্দ্রীয় সরকারের ‘প্রসাদ’ (Pilgrimage Rejuvenation and Spiritual, Heritage Augmentation Drive) যোজনার অধীনে অনুমোদিত হয়েছিল। এই প্রকল্পের জন্য প্রায় ৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়। প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল তীর্থযাত্রী এবং পর্যটকদের জন্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা, যার মধ্যে ছিল সৌন্দর্যায়ন, উন্নত পার্কিং ব্যবস্থা এবং একটি সুফি ব্যাখ্যা কেন্দ্র নির্মাণ। ওয়াকফ বোর্ডের দাবি, এই প্রকল্পের মাধ্যমে দরগাকে আন্তর্জাতিক মানের করে তোলা হয়েছে।

আইন ও সংবিধান কী বলছে?

ভারতের সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদ সমস্ত নাগরিককে ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার দিয়েছে। প্রত্যেকেই নিজের বিশ্বাস অনুযায়ী ধর্ম পালন ও প্রচার করতে পারে। তবে এই অধিকার জনশৃঙ্খলা, নৈতিকতা এবং স্বাস্থ্যের সাপেক্ষে সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে, জাতীয় প্রতীকের অপমান আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এই পরিস্থিতিতে, ধর্মীয় স্থানে জাতীয় প্রতীক স্থাপন করা আইনসম্মত কিনা, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ভিন্ন মত থাকতে পারে। বিষয়টি এখন ধর্মীয় অনুভূতি এবং জাতীয়তাবাদের এক জটিল টানাপোড়েনের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে।

এই ঘটনা কাশ্মীরের মতো একটি সংবেদনশীল অঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে। একদিকে ধর্মীয় পরিচয় এবং বিশ্বাস রক্ষার প্রশ্ন, অন্যদিকে জাতীয় প্রতীকের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের দায়বদ্ধতা – এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন প্রশাসনের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আলোচনার মাধ্যমে এবং পারস্পরিক সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমেই এই জটিল পরিস্থিতির সমাধান সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Chanchal Sen

চঞ্চল সেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক। তিনি একজন অভিজ্ঞ লেখক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক, যিনি পলিটিক্স নিয়ে লেখালিখিতে পারদর্শী। চঞ্চলের লেখায় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের গভীর বিশ্লেষণ এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর সঠিক উপস্থাপন পাঠকদের মুগ্ধ করে। তার নিবন্ধ এবং মতামতমূলক লেখা বস্তুনিষ্ঠতা ও বিশ্লেষণধর্মিতার কারণে পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। চঞ্চল সেনের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিভঙ্গি এবং গভীর গবেষণা তাকে রাজনৈতিক সাংবাদিকতার জগতে একটি স্বতন্ত্র স্থান প্রদান করেছে। তিনি তার লেখনীর মাধ্যমে পাঠকদের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে এবং সমাজে পরিবর্তন আনতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে চলেছেন।

আরও পড়ুন

UPSC CAPF AC Recruitment 2026 নোটিফিকেশন প্রকাশ — ৩৪৯ পদে আবেদন করুন এখনই! ভারত ট্যাক্সি চালু: ভারতের প্রথম কোঅপারেটিভ রাইড-হেলিং সেবা সম্পর্কে যা জানা দরকার ভারতে ক্যানসার প্রতিরোধী টিকা: সম্পূর্ণ তথ্য, বয়স এবং খরচ সংক্রান্ত নির্দেশিকা ২০২৬ ভারতের বাজেট ২০২৬-২৭ পর: সবচেয়ে নিরাপদ ও শক্তিশালী পাঁচটি বিনিয়োগ খাত — এক বিস্তারিত বিশ্লেষণ তৎকাল টিকিট বুকিংয়ে বৈপ্লবিক পরিবর্তন: এআই প্রযুক্তি ও আধার যাচাইয়ের মাধ্যমে দালাল প্রতিরোধে ভারতীয় রেলের নতুন পদক্ষেপ