বামা কালী: তারাপীঠের শ্মশান থেকে সাধনপীঠ, এক ‘খ্যাপা’ সাধকের বিশ্বাস ও দর্শনের ইতিহাস

‘বামা কালী’ নামটি শুনলেই আপামর বাঙালির মানসপটে ভেসে ওঠে বীরভূমের তারাপীঠ, দ্বারকা নদের তীরের মহাশ্মশান এবং সেই শ্মশানে সাধনরত ‘খ্যাপা’ সাধক বামাখ্যাপার (Bamakhepa) চিত্র। বামা কালী বস্তুত কোনও পৃথক দেবীসত্তা নন, তিনি দেবী কালীরই এক বিশেষ রূপ, যাঁর পূজা পদ্ধতি সাধারণ দক্ষিণাকালীর পূজার থেকে অনেকটাই আলাদা। এই রূপের ইতিহাস কোনও একটি নির্দিষ্ট দিনে শুরু হয়নি; এটি জড়িয়ে আছে প্রাচীন তন্ত্র সাধনা, সতীপীঠের পৌরাণিক কাহিনী এবং সর্বোপরি, উনিশ শতকের এক কিংবদন্তী সাধকের জীবন ও দর্শনের সঙ্গে। বামা কালীর ইতিহাস বুঝতে হলে তাই আমাদের ডুব দিতে হবে তারাপীঠের প্রাচীনত্বে, তান্ত্রিক ‘বামাচার’ বা বামমার্গের গুহ্য দর্শনে এবং সাধক বামাখ্যাপার জীবনে, যিনি এই দেবীর সঙ্গে একাত্ম হয়ে গিয়েছিলেন।

এই নিবন্ধে আমরা বামা কালীর ধারণার উৎপত্তি, তারাপীঠের ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক প্রেক্ষাপট, বামাখ্যাপার জীবন ও সাধনা এবং আধুনিক যুগে এই পূজার প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে বিস্তারিত ও তথ্যনিষ্ঠ বিশ্লেষণ করব। আমাদের লক্ষ্য হল, শুধুমাত্র ভক্তির দিকটি নয়, বরং ঐতিহাসিক, সামাজিক এবং দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই জটিল বিষয়টির একটি সম্পূর্ণ চিত্র তুলে ধরা।

বামা কালীর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ‘বামা’ শব্দের তাৎপর্য

‘বামা কালী’ নামটি দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত: ‘বামা’ এবং ‘কালী’। দেবী কালী হিন্দু শাক্ত ঐতিহ্যের প্রধানা দেবী, দশমহাবিদ্যার প্রথম রূপ। কিন্তু ‘বামা’ শব্দটি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং একাধিক অর্থ বহন করে।

‘বামা’ শব্দের আভিধানিক ও তান্ত্রিক অর্থ

আভিধানিক দিক থেকে, ‘বামা’ (Vama) একটি সংস্কৃত শব্দ যার অর্থ ‘বাম’ (Left) বা ‘বিপরীত’ (Adverse/Contrary)। এর আরেকটি অর্থ হলো ‘নারী’ বা ‘সুন্দরী নারী’। তান্ত্রিক ঐতিহ্যে, এই ‘বাম’ শব্দটি এক গভীর দার্শনিক অর্থ বহন করে।

হিন্দু তন্ত্র সাধনাকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়: দক্ষিণাচার (Dakshinachara) এবং বামাচার (Vamachara)

  1. দক্ষিণাচার (দক্ষিণ মার্গ): এটি হলো ‘ডান দিকের পথ’। এই মার্গের সাধনা সাধারণত শাস্ত্রীয় নিয়ম, শুদ্ধাচার, মন্ত্র জপ এবং সাত্ত্বিক উপাচারের মাধ্যমে করা হয়। সমাজের প্রচলিত ধর্মীয় রীতিনীতি এর অন্তর্ভুক্ত। গৃহস্থদের জন্য এই পথই প্রশস্ত বলে মনে করা হয়।
  2. বামাচার (বাম মার্গ): এটি ‘বাম দিকের পথ’ বা ‘বিপরীত মার্গ’। এই পথের সাধকরা প্রথাগত সামাজিক ও ধর্মীয় নিয়মাবলীকে অস্বীকার করেন বা সেগুলিকে অতিক্রম করার চেষ্টা করেন। বামাচারের মূল দর্শন হলো, যা কিছু সাধারণ মানুষের কাছে ‘অপবিত্র’ বা ‘অশুদ্ধ’ (যেমন— শ্মশান, মৃতদেহ, মদ, মাংস), সেগুলির মাধ্যমেই সাধনা করে দ্বৈতবোধ (শুদ্ধ-অশুদ্ধ, পবিত্র-অপবিত্র) অতিক্রম করা এবং চূড়ান্ত অদ্বৈত ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করা।

বামা কালী নামটি সরাসরি এই বামাচার বা ‘বামমার্গী’ সাধনার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর পূজা প্রচলিত শুদ্ধাচারের বাইরে গিয়ে তান্ত্রিক পদ্ধতিতে, বিশেষত শ্মশানে অনুষ্ঠিত হয়।

বামা কালী বনাম দক্ষিণাকালী: রূপ ও দর্শনের পার্থক্য

সাধারণত আমরা ঘরে বা মন্দিরে যে কালীর মূর্তি দেখি, তিনি হলেন দক্ষিণাকালী (Dakshinakali)

  • দক্ষিণাকালী: এই রূপে দেবীর দক্ষিণ পদ (ডান পা) শিবের বুকের উপর স্থাপিত থাকে। তিনি করালবদনা হলেও গৃহস্থের কাছে তিনি মঙ্গলময়ী, ভয়নাশিনী ও বরদাত্রী। তাঁর পূজা দক্ষিণাচারের অন্তর্গত, অর্থাৎ সাত্ত্বিক বা রাজসিক আচারে সম্পন্ন হয়।
  • বামা কালী: বামা কালী রূপে দেবীর বাম পদ (বাঁ পা) শিবের বুকের উপর স্থাপিত থাকে (যদিও তারাপীঠের মূর্তিতে এই রূপভেদ স্পষ্ট নয়, কারণ এটি মূলত ‘তারা’ মূর্তি)। এই ‘বামা’ নামটি তাঁর পূজা পদ্ধতির ভিন্নতাকে নির্দেশ করে। তারাপীঠের দেবীকে বামা কালী বলার প্রধান কারণ হলো, তিনি বামাচারী তান্ত্রিকদের আরাধ্য দেবী এবং বিশেষত সাধক বামাখ্যাপা এই ‘বাম’ বা বিপরীত মার্গের সাধক ছিলেন।

প্রকৃতপক্ষে, তারাপীঠের মূল দেবী হলেন উগ্র তারা (Ugra Tara), যিনি দশমহাবিদ্যার দ্বিতীয় রূপ। তান্ত্রিক শাস্ত্রে তারা এবং কালী अभिन्न, অর্থাৎ একই সত্তার দুই রূপ। বৌদ্ধ তন্ত্রেও দেবীর এই উগ্র রূপের উপাসনা প্রচলিত আছে। কিংবদন্তি অনুসারে, মহর্ষি বশিষ্ঠ এই তারার রূপটিই তিব্বত (বা মতান্তরে চীন) থেকে বাংলায় নিয়ে আসেন এবং এখানে তাঁর তান্ত্রিক সাধনা প্রবর্তন করেন। তাই, তারাপীঠের দেবী একইসঙ্গে তারা এবং কালী। আর বামাখ্যাপার সাধনার ফলে তিনি ‘বামা কালী’ নামে লোকমুখে প্রসিদ্ধি লাভ করেন।

তারাপীঠের ইতিহাস: সতীপীঠ থেকে মহাশ্মশান

বামা কালীর ইতিহাস তারাপীঠের (Tarapith) ইতিহাস থেকে অবিচ্ছেদ্য। এই স্থানটির মাহাত্ম্য পৌরাণিক যুগ থেকে শুরু করে ঐতিহাসিক যুগ পর্যন্ত বিস্তৃত।

পৌরাণিক ভিত্তি: সতীপীঠের উপাখ্যান

হিন্দু পুরাণ, বিশেষত ‘দেবী ভাগবত পুরাণ’‘কালিকা পুরাণ’ অনুসারে, দক্ষ যজ্ঞে সতী দেহত্যাগ করলে মহাদেব সেই মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে তাণ্ডব শুরু করেন। সৃষ্টি ধ্বংসের উপক্রম হলে বিষ্ণু তাঁর সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর দেহ খণ্ড-বিখণ্ড করেন। সেই দেহখণ্ডগুলি যেখানে পড়েছিল, সেগুলিই ‘শক্তিপীঠ’ বা ‘সতীপীঠ’ নামে পরিচিত হয়।

বিশ্বাস করা হয়, সতীর ‘নয়নতারা’ (Eye Ball) বা মতান্তরে ‘তৃতীয় নয়ন’ এই স্থানে পড়েছিল। ‘তারা’ (Star বা Eye Ball) নাম থেকেই এই পীঠের নাম হয় ‘তারাপীঠ’। প্রতি সতীপীঠেই একজন দেবী ও তাঁর ভৈরব (শিবের রূপ) অধিষ্ঠিত থাকেন। তারাপীঠের দেবী হলেন তারা এবং ভৈরব হলেন চন্দ্রচূড়

বশিষ্ঠ মুনির সাধনা ও তান্ত্রিক ঐতিহ্যের সূচনা

তারাপীঠের সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রাচীন ঋষি বশিষ্ঠের (Vashistha) নাম। কিংবদন্তি অনুসারে, বশিষ্ঠ মুনি বহু বছর ধরে দেবী তারার সাধনা করেও সিদ্ধিলাভ করতে পারছিলেন না। তখন তিনি হতাশ হয়ে স্থানত্যাগ করতে উদ্যত হন। দেবী তাঁকে স্বপ্নাদেশ দেন যে, তিনি যেন তিব্বত (মতান্তরে চীন) দেশে যান এবং সেখানে মহর্ষি বুদ্ধের (যাঁকে এখানে গৌতম বুদ্ধের তান্ত্রিক রূপ হিসাবে দেখা হয়) কাছ থেকে তান্ত্রিক সাধনা বা ‘চীনাচার’ (Chinachara) পদ্ধতি শিখে আসেন।

বশিষ্ঠ মুনি তাই করেন। তিনি তিব্বত থেকে বামাচারের সেই গুহ্য পদ্ধতি (পঞ্চমকার সাধনা) শিখে এসে তারাপীঠের মহাশ্মশানে পঞ্চমুণ্ডীর আসনেই প্রথম দেবীর সিদ্ধিলাভ করেন। এই কাহিনী প্রতীকীভাবে তুলে ধরে যে, তারাপীঠের সাধনা পদ্ধতি প্রথাগত বৈদিক আর্য রীতির (দক্ষিণাচার) সঙ্গে তান্ত্রিক বা অবৈদিক রীতির (বামাচার) এক অপূর্ব মিশ্রণ। এটিই বামা কালী বা উগ্র তারার সাধনার মূল ভিত্তি স্থাপন করে।

ঐতিহাসিক বিবর্তন ও মন্দির নির্মাণ

তারাপীঠের প্রাচীনত্ব অনস্বীকার্য হলেও, বর্তমানে আমরা যে মন্দিরটি দেখি তা তুলনামূলকভাবে আধুনিক। ঐতিহাসিকদের মতে, প্রাচীন মন্দিরটি কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গিয়েছিল।

  • পুনরুদ্ধার: কিংবদন্তি অনুসারে, পাল যুগের (আনুমানিক ৮ম থেকে ১২শ শতক) কোনও এক সময়ে ‘জয়দত্ত’ নামে এক বণিক দ্বারকা নদী দিয়ে বাণিজ্যে যাওয়ার পথে এই স্থানে দেবীর স্বপ্নাদেশ পান। তিনি জঙ্গল থেকে দেবীর শিলামূর্তি উদ্ধার করে একটি ছোট মন্দির নির্মাণ করেন।
  • বর্তমান মন্দির: বর্তমানে যে লাল ইটের মন্দিরটি দেখা যায়, তা নাটোরের (Natore) বিখ্যাত জমিদার রানী ভবানীর (Rani Bhabani) নির্দেশে বা তাঁর বংশধরদের তত্ত্বাবধানে নির্মিত হয়েছিল বলে মনে করা হয়। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, মন্দিরটি সম্ভবত ১৮শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে (আনুমানিক ১৭১৮ বা তার কিছু পরে) নাটোর রাজ পরিবারের কোনও সদস্য, সম্ভবত রাজা রামকান্ত রায় (রামকৃষ্ণ রায়ের পিতা), নির্মাণ বা পুনর্নির্মাণ করেন।

এই মন্দির নির্মাণের ফলে তারাপীঠ একটি অখ্যাত তান্ত্রিক সাধনার কেন্দ্র থেকে বৃহত্তর হিন্দু সমাজের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থক্ষেত্রে পরিণত হয়। কিন্তু এর প্রকৃত মাহাত্ম্য শীর্ষে পৌঁছায় উনিশ শতকে এক ‘খ্যাপা’ সাধকের আবির্ভাবে।

সাধক বামাখ্যাপা: বামা কালীর জীবন্ত বিগ্রহ

বামা কালীর ইতিহাস লিখতে গেলে সাধক বামাখ্যাপার (Sadhak Bamakhepa) জীবন ও দর্শনকে কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতেই হবে। তিনিই ছিলেন এই দেবীর সবচেয়ে বিখ্যাত পূজারী এবং তাঁর মাধ্যমেই ‘বামা কালী’ নামটি আপামর জনসাধারণের কাছে পৌঁছে যায়। বামাখ্যাপার জীবন ছিল প্রথাগত সামাজিক নিয়মের সম্পূর্ণ বিপরীত এক প্রতিচ্ছবি।

প্রারম্ভিক জীবন ও ‘খ্যাপা’ হয়ে ওঠা

বামাখ্যাপার আসল নাম ছিল বামাচরণ চট্টোপাধ্যায় (Bamacharan Chattopadhyay)। তাঁর জন্ম আনুমানিক ১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দে বীরভূমের আটলা গ্রামে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে হয়। ছোটবেলা থেকেই তাঁর প্রথাগত পড়াশোনায় মন ছিল না। তিনি বেশিরভাগ সময়ই গ্রামের শ্মশানে বা নির্জন প্রান্তরে ধ্যানমগ্ন অবস্থায় কাটিয়ে দিতেন। তাঁর আচরণ সাধারণ শিশুদের মতো ছিল না বলে লোকে তাঁকে ‘বামা’ (তাঁর নাম) এবং ‘খ্যাপা’ (পাগল) বলে ডাকতে শুরু করে।

খুব অল্প বয়সেই তিনি গৃহত্যাগ করেন এবং তারাপীঠের মহাশ্মশানে এসে উপস্থিত হন। এই শ্মশানই তাঁর গৃহ এবং সাধনক্ষেত্র হয়ে ওঠে।

মহাশ্মশানে সাধনা

তারাপীঠের শ্মশান (Mahashmashan) তন্ত্র সাধনার জন্য একটি আদর্শ স্থান হিসাবে বিবেচিত। তন্ত্র মতে, শ্মশান হলো এমন একটি স্থান যেখানে জীবন ও মৃত্যুর পর্দা সবচেয়ে পাতলা। এখানে সাধনা করলে সাধক সহজেই মায়া, মোহ, ভয় এবং সামাজিক সংস্কার (যেমন শুদ্ধ-অশুদ্ধের ভেদ) অতিক্রম করতে পারেন।

বামাখ্যাপা এই মহাশ্মশানেই তাঁর গুরু, সাধক কৈলাসপতি বাবার সান্নিধ্যে আসেন। তিনি গুরুর নির্দেশে পঞ্চমুণ্ডীর আসনে (পাঁচটি নির্দিষ্ট প্রাণীর মাথার খুলির উপর স্থাপিত আসন) কঠোর তান্ত্রিক সাধনা শুরু করেন। এই সাধনা ছিল বামাচারের অন্তর্গত। বামাখ্যাপা শ্মশানের চিতাভস্ম গায়ে মাখতেন, শ্মশানের কুকুরদের সঙ্গে বসে প্রসাদ খেতেন এবং মদ্যপান করে সমাধিস্থ হতেন। তাঁর এই আচরণগুলি সাধারণ মানুষের চোখে ‘পাগলামি’ বা ‘অশাস্ত্রীয়’ মনে হলেও, এগুলি ছিল তান্ত্রিক অদ্বৈত দর্শনের চরম নিদর্শন। তাঁর কাছে ‘পবিত্র’ ভোগ এবং কুকুরের খাওয়া ‘এঁটো’ খাবারের মধ্যে কোনও ভেদ ছিল না— সবই ছিল চিন্ময়ী মায়ের প্রসাদ।

বামা কালী ও বামাখ্যাপা: একাত্মতার উপাখ্যান

বামাখ্যাপার সাধনার মূল বৈশিষ্ট্য ছিল দেবীর প্রতি তাঁর ‘সন্তানসুলভ’ আবদার ও অধিকারবোধ। তিনি দেবীকে ‘মা তারা’ বা ‘বড় মা’ বলে ডাকতেন। তিনি মন্দিরের প্রথাগত নিয়মকানুনের ধার ধারতেন না।

  • মন্দিরের ভোগ: একটি বিখ্যাত কাহিনী অনুসারে, বামাখ্যাপা একদিন মন্দিরে দেবীর ভোগ নিবেদনের আগেই তা খেয়ে ফেলেন। এতে পূজারীরা ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁকে প্রহার করেন। কথিত আছে, সেই রাতেই নাটোরের রানী (মতান্তরে মন্দিরের প্রধান সেবাইত) স্বপ্নাদেশ পান যে, দেবী তারা ক্রুদ্ধা। কারণ তাঁর ‘খ্যাপা ছেলে’ (বামাখ্যাপা)-কে না খাইয়ে তাঁকে ভোগ নিবেদন করা হয়েছে। পরের দিন থেকে নির্দেশ জারি হয় যে, মন্দিরে মাকে ভোগ নিবেদনের আগে বামাখ্যাপাকে প্রসাদ দিতে হবে।
  • জীবন্ত কালী: বামাখ্যাপার কাছে দেবী শুধু পাথরের মূর্তি ছিলেন না, তিনি ছিলেন জীবন্ত। তিনি সরাসরি মায়ের সঙ্গে কথা বলতেন, ঝগড়া করতেন, আবদার করতেন। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, শাস্ত্রীয় আচারের চেয়েও বড় হলো ভক্তি এবং অধিকারবোধ।

বামাখ্যাপা হয়ে উঠেছিলেন শ্মশানের জীবন্ত শিব বা ভৈরব এবং দেবী তারা হয়েছিলেন তাঁর ‘বামা কালী’— সেই মা, যিনি তাঁর ‘বাম’ বা ‘খ্যাপা’ ছেলের সব আবদার মেনে নেন। ১৮৯৮ সালের দিকে (বাংলা ১৩০৮ সন) তাঁর দেহাবসান ঘটে, কিন্তু তিনি তারাপীঠের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকেন।

বামা কালীর পূজা পদ্ধতি ও তান্ত্রিক প্রভাব

বামা কালীর পূজা পদ্ধতি সাধারণ কালীপূজা থেকে অনেকটাই আলাদা। এটি সম্পূর্ণভাবে তান্ত্রিক বামাচার বা ‘চীনাচার’ পদ্ধতি দ্বারা প্রভাবিত।

পঞ্চমুণ্ডীর আসন ও শ্মশান সাধনা

বামা কালীর সাধনার কেন্দ্র হলো শ্মশান এবং পঞ্চমুণ্ডীর আসন (Panchamundi Asana)। তন্ত্রশাস্ত্র মতে, এই আসনে বসে সাধনা করলে দ্রুত সিদ্ধিলাভ হয়। এই আসন পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি দিয়ে তৈরি হয়— সাপ, শেয়াল, কুকুর, বাঁদর এবং মানুষ (মতান্তরে অন্য প্রাণী)। এই পঞ্চমুণ্ডী পঞ্চভূতের (ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম) বা পঞ্চ রিপুর (কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ) প্রতীক। এই আসনে বসে সাধনা করার অর্থ হলো এই রিপুগুলিকে বা জাগতিক বন্ধনকে অতিক্রম করা। বামাখ্যাপা এই আসনেই সিদ্ধিলাভ করেছিলেন।

পূজার উপাচার ও স্বাতন্ত্র্য

বামা কালীর পূজায় ‘পঞ্চমকার’ (Panchamakara) বা ‘পঞ্চ-তত্ত্ব’-এর ব্যবহার দেখা যায়, যা বামাচারের মূল অঙ্গ। এই পাঁচটি ‘ম’ কার হলো:

  1. মদ্য (Wine): কারণবারি বা মদ। তান্ত্রিক মতে এটি হলো অমৃত বা ব্রহ্মজ্ঞান।
  2. মাংস (Meat): পশুত্ব বা মায়া।
  3. মৎস্য (Fish): ইড়া ও পিঙ্গলা নামক দুই নাড়ী।
  4. মুদ্রা (Grain/Gesture): জাগতিক বন্ধন।
  5. মৈথুন (Union): জীবাত্মা ও পরমাত্মার মিলন (এটি একটি উচ্চমার্গের দার্শনিক তত্ত্ব, আক্ষরিক নয়)।

তারাপীঠের মন্দিরে দেবীকে প্রতিদিন মৎস্য (বিশেষত শোল মাছ পোড়া) এবং কারণবারি (মদ) নিবেদন করা হয়। এটি এই পীঠের তান্ত্রিক ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রমাণ। সাধারণ গৃহস্থরা যখন পূজা দেন, তখন তাঁরা সাত্ত্বিক ভোগ (মিষ্টি, ফল) দিলেও, দেবীর মূল তান্ত্রিক পূজা এই বামাচারী পদ্ধতিতেই হয়।

আধুনিক যুগে বামা কালীর প্রাসঙ্গিকতা ও পরিসংখ্যান

উনিশ শতকের এক শ্মশানচারী সাধকের আরাধ্য দেবী আজ একবিংশ শতাব্দীতেও লক্ষ লক্ষ মানুষের বিশ্বাস ও ভক্তির কেন্দ্রে রয়েছেন।

প্রধান তীর্থস্থান: তারাপীঠ

বামাখ্যাপার মহিমার ফলে তারাপীঠ আজ পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম প্রধান এবং ব্যস্ততম তীর্থস্থান। এটি শুধু তান্ত্রিক বা সাধকদের জন্য নয়, সাধারণ গৃহস্থদের কাছেও এক পরম আশ্রয়ের স্থান হয়ে উঠেছে।

  • তীর্থযাত্রীর পরিসংখ্যান: তারাপীঠের জনপ্রিয়তা পরিমাপ করা কঠিন হলেও, বিশেষ উৎসবগুলিতে জনসমাগম এর প্রমাণ দেয়। বিশেষত কৌশিকী অমাবস্যা (Kaushiki Amavasya) তিথিতে (যে তিথিতে বামাখ্যাপা সিদ্ধিলাভ করেছিলেন বলে মনে করা হয়) তারাপীঠে ভক্তদের সমাগম হয় দেখার মতো।
  • পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পর্যটন বিভাগ (West Bengal Tourism Department) এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের (যেমন, BBC Bengali বা Anandabazar Patrika) রিপোর্ট অনুযায়ী, কৌশিকী অমাবস্যার সময় মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে তারাপীঠে ৫ থেকে ১০ লক্ষ (500,000 to 1,000,000) ভক্ত ও পুণ্যার্থীর সমাগম হয়। এই বিপুল জনসমাগম এই স্থানের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বকে তুলে ধরে।

এই বিপুল সংখ্যক তীর্থযাত্রী এই অঞ্চলের অর্থনীতিতেও বড় ভূমিকা পালন করে। হোটেল, রেস্তোরাঁ, এবং পূজার সামগ্রীর ব্যবসা এই তীর্থস্থানকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে।

ধর্ম, সংস্কৃতি ও লোকজীবনে প্রভাব

বামা কালী এবং বামাখ্যাপা শুধুমাত্র মন্দিরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নন, তাঁরা বাংলা সংস্কৃতি ও লোকজীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছেন।

  • সাহিত্য ও চলচ্চিত্র: বামাখ্যাপার অলৌকিক জীবনকাহিনী নিয়ে অসংখ্য গ্রন্থ, নাটক, যাত্রা এবং চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। এই আখ্যানগুলি সমাজে বামা কালীর মাহাত্ম্যকে আরও প্রতিষ্ঠিত করেছে।
  • সামাজিক দর্শন: বামা কালীর দর্শন এক অর্থে সামাজিক প্রথাবিরোধী (Anti-establishment) দর্শন। বামাখ্যাপা দেখিয়েছিলেন যে, তথাকথিত ‘অশুদ্ধ’ শ্মশানে বা সমাজের নিম্নবর্গের (যেমন চণ্ডাল) সঙ্গে থেকেও ঈশ্বর লাভ সম্ভব। তাঁর কাছে শুদ্ধাচারের বাহ্যিক আড়ম্বরের চেয়ে অন্তরের শুদ্ধ ভক্তিই ছিল প্রধান। আধুনিক যুগেও, যখন মানুষ সামাজিক ভেদাভেদ এবং বাহ্যিক আড়ম্বরের জটিলতায় আবদ্ধ, তখন বামা কালীর এই ‘সহজ’ অথচ ‘বিপরীত’ দর্শন এক ভিন্ন পথের সন্ধান দেয়।

বামা কালীর ইতিহাস কোনও সরলরৈখিক ইতিহাস নয়। এটি পৌরাণিক সতীপীঠের শক্তি, প্রাচীন তান্ত্রিক সাধনার গুহ্য রহস্য এবং উনিশ শতকের এক আত্মভোলা সাধকের তীব্র ভক্তির এক মিলিত স্রোত। দেবী তারা এখানে ‘বামা কালী’ নামে পরিচিতা হয়েছেন, কারণ তিনি তাঁর ‘বাম’ বা ‘খ্যাপা’ সন্তান বামাখ্যাপার সব আবদার পূরণ করেছিলেন।

তারাপীঠের এই দেবী একদিকে যেমন উগ্রচণ্ডা, শ্মশানবাসিনী, তন্ত্রের দেবী; অন্যদিকে তেমনই তিনি ভক্তের কাছে স্নেহময়ী মা। বামা কালী ও বামাখ্যাপার এই উপাখ্যান আমাদের শেখায় যে, ঈশ্বর বা শক্তিকে লাভ করার কোনও একটি নির্দিষ্ট বা বাঁধা গতের পথ নেই। প্রথাগত আচারের বাইরে গিয়েও, তীব্র বিশ্বাস, অকপট ভক্তি এবং সমস্ত ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে উঠে সাধনা করলে, সেই ‘মহাশক্তি’-কে ‘মা’ বলে লাভ করা সম্ভব।