Think Bengal

চমকে দেওয়া পরিসংখ্যান: বিশ্বের ১০০ কোটি মানুষ মানসিক অসুস্থতায় ভুগছেন!

Published By: Soumya Chatterjee | Published On:
Share:

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) অভূতপূর্ব সতর্কবাণী অনুসারে, বর্তমানে পৃথিবীতে ১০০ কোটিরও বেশি মানুষ বিভিন্ন ধরনের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত “ওয়ার্ল্ড মেন্টাল হেলথ টুডে” এবং “মেন্টাল হেলথ অ্যাটলাস ২০২৪” শীর্ষক দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। উদ্বেগ এবং বিষণ্ণতাজনিত রোগই এসব মানসিক সমস্যার প্রধান কারণ, যা প্রতি বছর বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার ক্ষতির কারণ হচ্ছে।

গত মঙ্গলবার (সেপ্টেম্বর ১, ২০২৫) প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে যে, বিশ্বব্যাপী জনসংখ্যার প্রায় ১৪ শতাংশ মানুষ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। বিশেষ করে নারীরা পুরুষদের তুলনায় বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোট আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে ৫৮.১৫ মিলিয়ন নারী এবং ৫১.৩৯ মিলিয়ন পুরুষ রয়েছে।

মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা এখন দীর্ঘমেয়াদী অক্ষমতার দ্বিতীয় প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। WHO-র মহাপরিচালক ড. টেড্রোস আধানোম ঘেব্রেয়েসুস বলেছেন, “মানসিক স্বাস্থ্যসেবার রূপান্তর এখন সবচেয়ে চাপের জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জগুলির একটি। মানসিক স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ মানে মানুষ, সম্প্রদায় এবং অর্থনীতিতে বিনিয়োগ – এমন একটি বিনিয়োগ যা কোনো দেশই উপেক্ষা করার সামর্থ্য রাখে না।”

আত্মহত্যার হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। ২০২১ সালে আনুমানিক ৭ লাখ ২৭ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করেছেন, যা ২০১৯ সালের তুলনায় বেড়েছে। এটি বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর কারণগুলির মধ্যে ১.১ শতাংশ এবং ১৫-২৯ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে তৃতীয় প্রধান মৃত্যুর কারণ। প্রতিটি আত্মহত্যার বিপরীতে ২০টিরও বেশি আত্মহত্যার চেষ্টা হয়।

বিশ্বব্যাপী মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে কারণ সরকারি বাজেটে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বরাদ্দ অপ্রতুল রয়ে গেছে। বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র ২ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ব্যয় করা হয়, যা ২০১৭ সাল থেকে অপরিবর্তিত রয়েছে। উচ্চ আয়ের দেশগুলো প্রতি ব্যক্তি ৬৫ ডলার পর্যন্ত ব্যয় করলেও স্বল্প আয়ের দেশগুলো মাত্র ৪ সেন্ট ব্যয় করে।

চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রে বিশাল ব্যবধান রয়েছে। প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য মাত্র ১৩ জন মানসিক স্বাস্থ্য কর্মী রয়েছে। স্বল্প আয়ের দেশগুলোতে এই অবস্থা আরও ভয়াবহ – সাব-সাহারান আফ্রিকায় প্রতি ৫ লাখ মানুষের জন্য ১ জনেরও কম মনোচিকিৎসক আছে। ভারতে প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য মাত্র ০.৭৫ জন মনোচিকিৎসক রয়েছে।

স্বল্প আয়ের দেশগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসার ব্যবধান ৭০-৯২ শতাংশ পর্যন্ত। মানসিক বিকৃতিজনিত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে স্বল্প আয়ের দেশে মাত্র ১০ শতাংশের কম চিকিৎসা পায়, অথচ উচ্চ আয়ের দেশে এ হার ৫০ শতাংশের বেশি। শুধুমাত্র ২২টি দেশ সাইকোসিস রোগের চিকিৎসা কভারেজের জন্য পর্যাপ্ত তথ্য প্রদান করেছে।

ভারতের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, দেশে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার হার উদ্বেগজনক। ২০১৯ সালের জাতীয় জরিপ অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ১৮.৭ শতাংশ এবং শিশুদের মধ্যে ১২.৬ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত। কোভিড-১৯ মহামারী পরবর্তী সময়ে এই হার আরও বেড়েছে – প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে বিষণ্ণতার লক্ষণ ৫৭.৯ শতাংশ, মানসিক চাপ ৫৯.৭ শতাংশ এবং উদ্বেগের লক্ষণ ৩৩.৭ শতাংশ।

ভারতের মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসায় বিশাল সমস্যা রয়েছে। সরকার মোট স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র ০.৪৪ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ব্যয় করে। জনসংখ্যার ০.১১ শতাংশেরও কম বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় সাইকোট্রপিক ওষুধের সুবিধা পায়। দেশে পর্যাপ্ত সংখ্যক মানসিক স্বাস্থ্য পেশাদার নেই এবং সামাজিক কলঙ্কের কারণে রোগীরা চিকিৎসা নিতে ভয় পায়।

সামাজিক কুসংস্কার এবং কলঙ্ক মানসিক স্বাস্থ্য সেবা গ্রহণে বড় বাধা। অনেক সমাজে মানসিক রোগকে অশুভ আত্মার আছর বা ভৌতিক কারণের ফল বলে মনে করা হয়। এর ফলে রোগীরা সাহায্য চাইতে দ্বিধা করেন এবং তাদের বিরুদ্ধে বৈষম্য হয়। স্বল্প ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এই কলঙ্কের প্রভাব আরও তীব্র।

অর্থনৈতিক প্রভাবের দিক থেকে দেখলে, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ বিশাল। শুধুমাত্র বিষণ্ণতা এবং উদ্বেগজনিত রোগের কারণে বছরে ১ ট্রিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়। বিভিন্ন দেশের জিডিপির ০.৫ থেকে ১ শতাংশ পর্যন্ত মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে ক্ষতি হয়। ২০৩০ সাল নাগাদ এই ক্ষতির পরিমাণ ৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছতে পারে।

কর্মক্ষেত্রেও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার প্রভাব ব্যাপক। বছরে প্রায় ১২০০ কোটি কাজের দিন হারিয়ে যায় শুধুমাত্র বিষণ্ণতা এবং উদ্বেগের কারণে। এটি ৫০ মিলিয়ন বছরের সমান কাজের সময়।

আশার কথা হলো, কিছু ইতিবাচক অগ্রগতিও হয়েছে। ২০২০ সালের পর থেকে বেশিরভাগ দেশ তাদের মানসিক স্বাস্থ্য নীতি এবং পরিকল্পনা শক্তিশালী করেছে। ৮০ শতাংশের বেশি দেশ এখন জরুরি অবস্থায় মানসিক স্বাস্থ্য এবং মনোসামাজিক সহায়তা অন্তর্ভুক্ত করেছে, যা ২০২০ সালে ছিল ৩৯ শতাংশেরও কম। টেলিহেলথ সেবাও আরও ব্যাপকভাবে উপলব্ধ হচ্ছে।

প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় মানসিক স্বাস্থ্যের একীকরণও এগিয়ে চলেছে। ৭১ শতাংশ দেশ WHO-র পাঁচটি প্রস্তাবিত মানদণ্ডের মধ্যে অন্তত তিনটি পূরণ করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় মানসিক স্বাস্থ্য অন্তর্ভুক্ত করার কাজ শুরু করেছে।

তবে এই অগ্রগতি আইনি সংস্কারে রূপান্তরিত হয়নি। কম দেশই অধিকার-ভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্য আইন গ্রহণ বা প্রয়োগ করেছে এবং মাত্র ৪৫ শতাংশ দেশের আইন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সাথে সম্পূর্ণভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানসিক স্বাস্থ্য সেবায় জরুরি বিনিয়োগ এবং কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজন। সামাজিক কলঙ্ক দূরীকরণ, দক্ষ চিকিৎসক তৈরি, পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় মানসিক স্বাস্থ্যের একীকরণ জরুরি। WHO-র মতে, মানসিক স্বাস্থ্য সেবাকে বিশেষ সুবিধা নয় বরং মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে আত্মহত্যার হার এক-তৃতীয়াংশ কমানোর লক্ষ্য রয়েছে। কিন্তু বর্তমান অগ্রগতির হারে মাত্র ১২ শতাংশ কমানো সম্ভব হবে। এজন্য আরও জোরালো প্রচেষ্টা এবং বহুমুখী সহযোগিতার প্রয়োজন।

বিশ্বব্যাপী মানসিক স্বাস্থ্য সংকট মোকাবেলায় সরকার, বেসরকারি সংস্থা, পরিবার এবং সমাজের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার। প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার, অনলাইন কাউন্সেলিং সেবা বিস্তার, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক সহায়তা নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করার মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধানে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।

Soumya Chatterjee

সৌম্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে স্নাতক এবং প্রযুক্তি বিষয়ক লেখালিখিতে বিশেষ আগ্রহী। তিনি একজন উদ্যমী লেখক, যিনি প্রযুক্তির জটিল ধারণাগুলোকে সহজভাবে উপস্থাপন করতে দক্ষ। তার লেখার মূল ক্ষেত্রগুলোতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে নতুন প্রযুক্তি, গ্যাজেট রিভিউ, সফটওয়্যার গাইড, এবং উদীয়মান টেক প্রবণতা। সৌম্যর প্রাঞ্জল ও তথ্যবহুল লেখনী পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। প্রযুক্তি সম্পর্কে তার গভীর জ্ঞান এবং অনুসন্ধিৎসু মনোভাব তাকে পাঠকদের কাছে বিশেষভাবে জনপ্রিয় করে তুলেছে। টেক জগতে চলমান পরিবর্তনগুলির সাথে তাল মিলিয়ে সৌম্য সর্বদা নতুন ও তথ্যসমৃদ্ধ বিষয়বস্তু নিয়ে আসতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

আরও পড়ুন

যেভাবে ক্ষমতার শীর্ষে উঠে এসেছিলেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি দুনিয়ার সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিও যে ৭টি কাজ করতে পারেন না — মার্কিন প্রেসিডেন্টের লুকানো সীমাবদ্ধতা সামরিক শক্তিতে বিশ্বে চতুর্থ ভারত: নতুন র‍্যাঙ্কিংয়ে চমকপ্রদ তথ্য প্রকাশ এপস্টেইন ফাইল: যে ভয়ংকর নথি পৃথিবীর ক্ষমতাধরদের কলঙ্কিত করেছে যৌন সংক্রামিত পরজীবী বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা: বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা